ই-সিম কী? ই-সিমের সুবিধা ও অসুবিধা এবং ব্যবহারের নিয়ম

ই-সিম কী? ই-সিমের সুবিধা ও অসুবিধা এবং ব্যবহারের নিয়ম

ই-সিম কি?

প্রযুক্তি উন্নয়নের সাথে সাথে আমাদের জীবনমানেরও উন্নত হচ্ছে। প্রযুক্তির একের পর এক অবিশ্বাস্য উদ্ভাবণ চমকে দিচ্ছে পুরো বিশ্বকে।

কিছুদিন আগে গুগল ঘোষণা দিয়েছিল যে, স্মার্টফোনে আর থাকবে না সিম স্লট। গুগলের এমন ঘোষণার পর অনেকের মনে প্রশ্ন আসে তাহলে কীভাবে হবে যোগযোগ?

এসব প্রশ্নের উত্তরে গুগল স্মার্টফোনে ই-সিম ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছিলো। মোবাইলে ই-সিম ব্যবহার করলে একইসাথে এক থেকে পাঁচটি পর্যন্ত সিম ব্যবহার করা যাবে। এর জন্য একদিকে যেমন ফোনের জায়গা বেচে যাবে অন্যদিকে একাধিক সিম কেনার খরচও বাচবে। ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্বজুড়ে ২০২৫ সালের মধ্যে ই-সিমের ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩.৪ বিলিয়ন হবে।

 

আরও পড়ুন:

মোবাইল ফোন কি? মোবাইল ফোনের জনক, বৈশিষ্ট্য, সুবিধা ও অসুবিধা

মোবাইল বা সেলুলার ফোন কি? মোবাইল ফোন কত প্রকার ও কী কী?

ই মেইল কি বা কাকে বলে? ইমেইল এর সুবিধা ও অন্যান্য তথ্য

 

তবে অনেকেই হয়তো এখনো জানেন না ই-সিম কি বা ই-সিম কাকে বলে? ই-সিম কীভাবে কাজ করে। ই-সিম এর সুবিধা ও অসুবিধা কি কি? ই-সিম ব্যবহারের নিয়ম ইত্যাদি। তাহলে চলুন শুরু করা যাক…

 

ই-সিম কাকে বলে? (What is eSIM?)

স্মার্টফোনে ইনস্টল করা এক ধরনের ভার্চুয়াল সিমকে ই-সিম (eSIM) বলে। ই-সিমের পুরো নাম হচ্ছে Embedded Subscriber Identity Module (এমবেডেড সাবস্ক্রাইবার আইডেন্টিটি মডিউল)।

এটি ফিজিক্যাল সিমের বিপরীত অবস্থা। এই সিম খালি চোখে দেখা যাবে না। আপনাকে বিকাশে কিংবা নগদে নানান মানুষের কাছে টাকা পাঠাই। সেখানে কাগজের টাকার যেমন অস্তিত্ব থাকেনা কিন্তু কাগজের টাকার ন্যায় সকল কাজ সম্পন্ন করা যায় তেমনি ই-সিমের ফিজিক্যাল অস্তিত্ব না থাকলেও আপনি সকল কাজ করতে পারবেন।

 

ই-সিম কীভাবে কাজ করে? (How does eSIM work?)

ই-সিম (eSIM) কার্ড মোবাইল ফোনের মধ্যে chip দিয়ে embed করা আছে। অর্থ্যাৎ ফোনের মধ্যে আলাদা কোনো জায়গায় সিম লাগানোর প্রয়োজন নাই। eSIM কার্ড ভার্চুয়াল সিম হওয়ার কারণে সফটওয়্যারের মাধ্যমে কাজ করে। এই সিম ভার্চুয়াল হওয়ার কারণে এক ফোন থেকে সরিয়ে অন্য আরেকটি ফোনে স্থানান্তর করা যাবে না। তবে, কোন কারণে ফোনটি বিক্রি বা না চালালে সিমটি নিষ্ক্রিও করার পদ্ধতিও রয়েছে।

 

আরও পড়ুন:

কম্পিউটার কাকে বলে? কম্পিউটারের বৈশিষ্ট্য, প্রকারভেদ ও ব্যবহার

ইন্টারনেট কাকে বলে? ইন্টারনেট কত প্রকার? সুবিধা ও অসুবিধা

 

গ্রামীনফোন ই-সিম সেবা

ইতিমধ্যে সর্বপ্রথম বাংলাদেশ ই-সিম নিয়ে এসেছে গ্রামীনফোন কোম্পানি। প্রিপেইড (নিশ্চিন্ত), পোস্টপেইড (মাই প্ল্যান), মাইগ্রেশন (প্রিপেইড এবং পোস্টপেইড) তিনভাবেই পাওয়া যাচ্ছে গ্রামীণফোনের ই-সিম।
গ্রামীণফোনের নতুন এই সেবা গ্রহন করতে চাইলে আপনার ই-সিম সাপোর্ট করে এমন ডিভাইস থাকতে হবে। তারপর এই ডিভাইস নিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামের গ্রামীণফোনের এক্সপেরিয়েন্স সেন্টারে যেতে হবে। তারপর আপনার এনআইডি কার্ড দিয়ে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করতে হবে। তারপর ই-সিমের জন্য আবেদন করতে হবে। তাছাড়া অনলাইনে গ্রামীণফোন শপের মাধ্যমে আপনি ই সিমের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

 

গ্রামীনফোন ই-সিমের দাম

ই-সিমের নতুন সংযোগের জন্য গ্রামীনফোন কম্পানি সিমের দাম নির্ধারণ করেছে ২০০ টাকা। তবে, কেউ যদি তার প্লাস্টিক সিম থেকে ই-সিমে রুপান্তর করতে চায় তাহলে তাকে ৯৯ টাকা ফি দিতে হবে।

একটি ই-সিমে একাধিক নেটওয়ার্ক ও নম্বর সংযুক্ত করা যাবে। তবে, সেটি নির্ভর করবে ব্যবহৃত হ্যান্ডসেটের ওপর।

 

আরও পড়ুন:

জিএসএম কি বা কাকে বলে? জিএসএম এর বৈশিষ্ট, সুবিধা-অসুবিধা

সিডিএমএ কি বা কাকে বলে? সিডিএমএ এর বৈশিষ্ট, সুবিধা-অসুবিধা

জিএসএম ও সিডিএমএ এর মধ্যে পার্থক্য কী?

 

সিম ব্যবহারের সুবিধা (Advantages of an eSIM?)

  • একটি সিমের মাধ্যমে কলিং ও মেসেজিংসহ সকল কাজই করা যাবে।
  • ফোনে সিম স্লট থাকবে না। এটি টেলিকম কোম্পানির মাধ্যমে ওভার-দ্য-এয়ার সক্রিয় থাকবে।
  • ব্যবহারকারী কোন কারণে সিম কোম্পানি পরিবর্তন করতে চাইলে সিম কার্ড পরিবর্তন করতে হবে না।
  • বৃষ্টি বা অন্য কোন কারণে ফোন ভিজে গেলেও ই-সিমের কোনো সমস্যা হবেনা।
  • ফিজিক্যাল সিমের মতো বার বার খোলার জামেলা না থাকায় এটি এ সিম নষ্ট হওয়ারও আশঙ্কা নেই।
  • এ ছাড়া একই সাথে একাধিক সিম ব্যবহার করার কারণে সিমও কিনতে হবে না।
  • একইসাথে এক ফোনে পাঁচটি পর্যন্ত ই-সিম ব্যবহার করা যাবে।
  • ব্যবহারকারী অন্য দেশে বা বিদেশ ভ্রমনেও ই-সিম ব্যবহার করতে পারবেন। লোকাল নম্বর পেতে এ সিম সেখানে কাজে লাগবে।
  • ই-সিম কার্ড সহজেই ওয়ার্ক এবং পার্সোনাল আলাদা কাজে ব্যবহার করা যাবে।

 

ই-সিম ব্যবহারের অসুবিধা (Disadvantages of e sim)

ই-সিম ব্যবহারের সুবিধার পাশাপাশি কিছু অসুবিধাও রয়েছে। যেমন-

  • একসাথে অনেকগুলো সিম ব্যবহার করলেও একটিতে কল আসলে অন্যগুলো বন্ধ দেখাবে।
  • এক ফোন থেকে অন্য ফোনে ই-সিম স্থানান্তর করা যাবে না।
  • ডিভাইস পরিবর্তন করার সময় সিম কোম্পানির সাথে যোগাযোগের প্রয়োজন হতে পারে।

তবে সকল দিকে বিবেচনায় ই-সিমের ‍অসুবিধার চেয়ে সুবিধা বেশি। তাই, আশা করা যায়, আগামীতে ই-সিম সকল প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে আধুনিক ও স্মার্ট একটি জনপ্রিয় সিম হয়ে উঠবে।

 

ই-সিম আর নরমাল সিমের পার্থক্য কী?

নরমাল সিম (বর্তমান সিম কার্ড) হলো প্লাস্টিক ও বিভিন্ন উপাদান দিয়ে তৈরি এক ধরনের বস্তু। যা দেখা যায় এবং এক মোবাইল থেকে খুলে অন্য মোবাইলে স্থানান্তর করা যায়। অন্যদিকে, ই-সিম হচ্ছে অনেকটা মোবাইল অ্যাপের মতো। যা স্মার্টফোনে কিআর কোড স্ক্যানের মাধ্যমে Active করে use করতে হয়।

 

যেসব ফোনে ই-সিম ব্যবহার করা যাবে

প্রাথমিকভাবে আইফোন, স্যামসাং ও গুগল পিক্সেলের নির্ধারিত কিছু মডেলের স্মার্টফোনে গ্রামীণফোনের ই-সিম ব্যবহার করা যাবে-

Apple:

  • iPhone 13, 13 Pro, 13 Pro Max, 13 Mini
  • iPhone 12, 12 Pro, 12 Pro Max, 12 Mini
  • iPhone 11, 11 Pro, 11 Pro Max
  • iPhone SE
  • iPhone XS, XS Max
  • iPhone XR
  • iPad Pro 12.9‑inch (4th generation and 3rd generation)
  • iPad Pro 11‑inch (2nd generation and 1st generation)
  • iPad Air (4th generation and 3rd generation)
  • iPad (8th generation and 7th generation)
  • iPad mini (5th generation)

 

Samsung

  • Samsung Galaxy S22 5G, Ultra 5G, S22
  • Samsung Fold LTE model
  • Samsung Galaxy Z Fold3 5G, Samsung Galaxy Z Flip 5G, Samsung Galaxy Z Flip
  • Samsung Galaxy Z Fold2 5G, Samsung Galaxy Fold
  • Samsung Galaxy S21+ 5G, Samsung Galaxy S21 Ultra 5G
  • Samsung Galaxy Note 20 Ultra, Ultra 5G, Samsung Galaxy Note 20 FE 5G, Samsung Galaxy Note 20 FE
  • Samsung Galaxy S20, S20+ and S20 Ultra

 

Google Pixel

  • Google Pixel 6 Pro, Google Pixel 6
  • Google Pixel 5a 5G, Google Pixel 5
  • Google Pixel 4a, Google Pixel 4
  • Google Pixel 3 & 3XL (Limited support)
  • Google Pixel 2

মটোরোলা

  • মটোরোলা রেজার (এ কোনো সিম স্লট নেই, শুধু ই-সিম রয়েছে)।

এছাড়া এই লিংক থেকে eSIM সাপোর্টেড ডিভাইস গুলোর পুরো তালিকাটি দেখা যাবে।

 

যেসব স্মার্ট ওয়াচে ই-সিম সেবা চালু রয়েছে।

  • Apple Watch এর সকল সিরিজ। যেমন, সিরিজ ৬, সিরিজ ৫, সিরিজ ৪, সিরিজ ৩।
  • Samsung Galaxy Watch.
  • Huawei Watch.

নতুন ই-সিম অ্যাকটিভ করবেন যেভাবে

জিপি সেন্টার কিংবা GP online shop এ গিয়ে ফিজিক্যাল সিমকে ই-সিমে রিপ্লেস করা যাবে। সেজন্য নিচের ধাপ অনুসরণ করতে হবে। তাহলে বর্তমান সিম ই-সিমে কনভার্ট করা যাবে। আপনি চাইলে নতুন ই-সিমও নিতে পারবেন।

১. পছন্দ অনুযায়ী একটা প্ল্যান বেছে নিন।
২. তারপর নিজের পছন্দ মতো মোবাইল নম্বরটি বেছে নিন।
৩.বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করুন।
৪. আপনার স্মার্টফোনে ইন্টারনেট কানেকশন নিশ্চিত করুন।
৫. সিম কিটে দেওয়া QR কোডটি স্ক্যান করুন।

আপনার হ্যান্ডসেট অনুযায়ী ধাপে ধাপে নিচের প্রসেসটি সম্পূর্ণ করুন-

আইফোনে ই-সিম অ্যাকটিভ করবেন যেভাবে

১. প্রথমে আপনাকে Settings এ যেতে হবে।
২. Cellular কিংবা Mobile internet সংযোগ বেছে নিন।
৩. ইন্টারনেট প্ল্যান যোগ করতে ট্যাপ করুন।
৪. QR কোডটি স্ক্যান করুন।

৫. ডিভাইসটি Wi-Fi অথবা Mobile internet এর সাথে সংযোগ নিশ্চিত করে QR কোডটি স্ক্যান করুন।
৬. ধাপে ধাপে প্রসেসটি সম্পূর্ণ করুন।

এরপর আপনার মোবাইল প্ল্যান ডাউনলোড এবং ই-সিম অ্যাক্টিভেট হয়ে যাবে।

 

স্যামসাং ফোনে ই-সিম অ্যাকটিভ করবেন যেভাবে

১. Settings -এ যেতে হবে > connection > SIM card manager
২. ইন্টারনেট প্ল্যান যোগ করতে ট্যাপ করুন।
৩. QR কোডটি ব্যবহার করতে ট্যাপ করুন।
৪. ডিভাইসটি Wi-Fi অথবা Mobile internet এর সাথে সংযোগ নিশ্চিত করে QR কোডটি স্ক্যান করুন।
৫. ধাপে ধাপে প্রসেসটি সম্পূর্ণ করুন।

এরপর আপনার মোবাইল প্ল্যান ডাউনলোড এবং ই-সিম অ্যাক্টিভেট হয়ে যাবে।

 

ই-সিম নিয়ে যেসব বিষয় যা মনে রাখতে হবে

১. QR কোডটি Unique এবং এক বছরে সর্বোচ্চ দুইবার ব্যবহার করা যাবে। Scan করা হয়ে গেলে ক্যারিয়ার অ্যাড করা নিশ্চিত করতে হবে।

২. ই-সিম Settings থেকে কখনই Delete অপশন Select করবেন না। এটা হলে ই-সিম প্রোফাইলটা স্থায়ীভাবে Delete হয়ে যাবে।

৩. প্রোফাইল Delete হয়ে গেলে, গ্রাহককে পুনরায় QR কোড স্ক্যান করে, পূর্ববর্তী প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করতে হবে।

#######

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button