আইন কি বা আইন কাকে বলে? আইনের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য ও উৎস কী?

আইন কি? আইন সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা

আইন সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা

প্রতিটি দেশের মানুষের আইন সম্পর্কে ভাল ধারনা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। আইন কি? বা আইন কাকে বলে বা কোন কোন নিয়ম ভঙ্গ করলে আইন ভঙ্গ করা হয় এসব না জানলে নিজেকে যে কোন সময় অপরাধী করার সুযোগ থাকে। তাই আমাদের আজকের বিস্তারিত আলোচনা আইন নিয়ে।

আইন কাকে বলে?

সমাজ স্বীকৃত ও রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত নিয়ম-কানুনকে আইন বলেন। যা মানুষের বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে।

মানুষের মঙ্গলের জন্য আইন (Law) প্রণয়ন করা হয়। আইনের মাধ্যমে ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির, ব্যক্তির সাথে রাষ্ট্রের এবং রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্ধারণ হয়। রাষ্ট্র অথবা সার্বভৌম কোনো কর্তৃপক্ষ দ্বারা আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা হয়। তবে, আইন অমান্য করলে শাস্তির বিধান রয়েছে।

আইনের বৈশিষ্ট্য সমূহ

আইনের কতগুলো মৌলিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। নিম্নে সেগুলো আলোচনা করা হলো-

  • বিধিবদ্ধ নিয়মাবলি : কতগুলো প্রথা, রীতি-নীতি ও নিয়মকানু‘নের সম‘ষ্টি হচ্ছে আইন।
  • বাহ্যিক আচরণের সাথে যুক্ত : আইন মানুষের বাহ্যিক আচরণ এবং কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে। কো মানুষ আইনবিরোধী কোন কাজ করলে শাস্তি পেতে হয়। শাস্তির ভয়ে মানুষ অপরাধ থেকে বিরত থাকে।
  • রাষ্ট্রীয় অনুমোদন ও স্বীকৃতি: রাষ্ট্র সমাজের যেসব নিয়ম অনুমোদন করে, সেগুলো আইনে পরিণত হয়। আইনের পিছনে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব থাকে। রাষ্ট্রীয় অনুমোদন ও স্বীকৃতি ছাড়া কোনো বিধিবিধান কখনো আইনে পরিণত হয় না।
  • ব্যক্তিস্বাধীনতার রক্ষক : ব্যক্তিস্বাধীনতার রক্ষক হিসেবে আইন কাজ করে। সেজন্য আইনকে ব্যক্তিস্বাধীনতার ভিত্তি বলা হয়।
  • সর্বজনীন : আইন সর্বজনীন। আইনের দৃষ্টিতে সমাজের সকল ব্যক্তি সমান। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, নারী পুরুষ, ধনী, দরিদ্র সবার জন্য আইন সমানভাবে প্রযোজ্য।

 

আইন কত প্রকার?

আইনকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

১। সরকারি আইন।

২। বেসরকারি আইন।

৩। আন্তর্জাতিক আইন।

সরকারি আইন কাকে বলে?

ব্যক্তির সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক বজায় রাখতে যেসকল আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা হয়। সেসব আইনকে সরকারি আইন বলে।

সরকারি আইনকে আ‘বা‘র কয়েক‘টি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন-

১) ফৌজদারি আইন ও দণ্ডবিধি : রাষ্ট্রের বিচার বিভাগের কাজ পরিচালনার জন্য ফৌজদারি আইন ও দণ্ডবিধি প্রণয়ন করা হয়।  কোন কারণে রাষ্ট্রের কোন ব্যক্তির অধিকার ক্ষুন্ন হলে এ আইনের সাহায্যে ওই ব্যক্তির অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হয় ।

২) প্রশাসনিক আইন: রাষ্ট্রের শাসন বিভাগ ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রশাসনিক আইন প্রণয়ন করা হয় । এ আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ পরিচালিত হয় ।

৩) সাংবিধানিক আইন : রাষ্ট্রের সংবিধানে এ ধরনের আইন উল্লেখ থাকে। সাংবিধানিক আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়।

আরও পড়ুন:

পরিবার কাকে বলে? পরিবারের শ্রেণিবিভাগ 

যৌথ পরিবারের সুবিধা ও অসুবিধা

শাসন বলতে কি বুঝায়?

বেসরকারি আইন কি বা কাকে বলে?

ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক রক্ষার জন্য যে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা হয়, তাকে বেসরকারি আইন বলে । যেমন- চুক্তি ও দলিল-সংক্রান্ত আইন ইত্যাদি।  সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় এ ধরনের আইন  সহায়তা করে।

আন্তর্জাতিক আইন কি বা কাকে বলে?

এক রাষ্ট্রের সাথে অন্য রাষ্ট্রের সম্পর্ক বজায় রাখতে যে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা হয়, তাকে আন্তর্জাতিক আইন বলে।একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সাথে কেমন আচরণ করবে, এক রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের নাগরিকদের সাথে কেমন ব্যবহার করবে, কীভাবে আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধান করা হবে এই আইনের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়।

আইনের উৎস কী?

আইনের উৎপত্তি বিভিন্ন উৎস থেকে হতে পারে। আইনের উৎসগুলো নিম্নে বর্ণিত হলো।

১)  প্রথা:  দীর্ঘকাল ধরে‍ কোনো নিয়ম সমাজে চলতে থাকলে তাকে প্রথা বলে। রাষ্ট্র সৃষ্টির আগে এই প্রথার মাধ্যমে মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ হতো। তবে, রাষ্ট্র সৃষ্টির পর সেসব প্রথা রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদন লাভ করলে সেগুলো আইনে পরিণত হয়। যুক্তরাজ্যের অনেক আইন এই প্র‘থা‘র উপ‘র ভি‘ত্তি করে সৃষ্টি হ‘য়েছে।

২) ধর্ম: ধর্মীয় অনুশাসন এবং ধর্মগ্রন্থ আইনের অন্যতম উৎস। সকল ধর্মের কিছু অনুশাসন রয়েছে, ঐ ধর্মের লোকেরা মেনে চলে। সমাজ জীবনকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত করতে এসব অনুশাসন ব্যাপক সহায়তা করে। ফলে এসব ধর্মীয় অনুশাসনের অনেক কিছুই পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাভের মাধ্যমে আইনে পরিণত হয় । যেমন- মুসলিম আইন, হিন্দু আইন ইত্যাদি।

৩) আইনবিদদের গ্রন্থ: বিচারকগণ কোনো মামলার বিচারকার্য সম্পাদন করতে গিয়ে যদি আইন সংক্রান্ত কোনো জটিলতায় পড়েন তাহলে তারা তা সমাধানের জন্য আইন-বিশারদদের বিজ্ঞানসম্মত গ্রন্থের সাহায্য নিয়ে আইনের ব্যাখ্যা প্রদান করেন। যা পরবর্তী সময়ে আইনে পরিণত হয়। যেমন- অধ্যাপক ডাইসি‘র ‘ল অব দ্যা কনস্টিটিউশন’ ও ব্লাকস্টোনে‘র ‘কমেনটরিজ অন দ্যা লজ অব ইংল্যান্ড’।

৪) বিচারকের রায় : আদালতে উত্থাপিত মামলার বিচার পরিচালনার জন্য প্রচলিত আইন অস্পষ্ট হলে বিচারকগণ তাদের প্রজ্ঞা ও বিচারবুদ্ধির মাধ্যমে ঐ আইনের ব্যাখ্যা প্রদান করেন এবং উক্ত মামলার রায় প্রদান করেন। পরবর্তীকালে বিচারকগণ সেসব রায় অনুসরণ করে বিচার পরিচালনা করেন। এভাবে পরবর্তীকালে বিচারকের রায় আইনে পরিণত হয়। তাই, বলা যায়, বিচারকের রায় আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

৫) ন্যায়বোধ : অনেক মামলা সমাধানের জন্য অনেক সময় কোনো আইন বিদ্যমান থাকে না। সে অবস্থায় বিচারকগণ তাদের ন্যায়বোধের মাধ্যমে বিচারকাজ সম্পাদন করেন । যা পরবর্তী সময়ে তা আইনে পরিণত হয় ।

৬) আইনসভা : আধুনিককালে আইনের প্রধান উৎস হচ্ছে আইনসভা। দেশের জনমতের সাথে সঙ্গতি রেখে বিভিন্ন দেশের আইনসভা নতুন আইন প্রণয়ন করে ও পুরাতন আইন সংশোধন করে যুগোপযোগী করে তোলে ।

 

####

এই পোস্ট থেকে আমরা আইন কি বা আইন কাকে বলে? আইনের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য ও উৎস কী?  সম্পর্কে জানতে পারলাম। পোস্টটি কেমন লাগলো আমাদের কমেন্ট করে জানান। ধন্যবাদ।

Back to top button