প্লেজারিজম কি বা কাকে বলে? প্লেজারিজমের প্রকারভেদ ও ধরার কৌশল

প্লেজারিজম  (Plagiarism)

প্লেজারিজম কি?

প্লেজারিজম (Plagiarism) একটি অপরাধ। এর বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে চৌর্যবৃত্তি। অন্যের কোন লেখা বা তথ্য নিজের বলে চালিয়ে দেওয়ার নাম প্লেজারিজম বা চৌর্যবৃত্তি। প্লেজারিজম সম্পর্কে অনেকে হয়ত জানেন, আবার অনেকে হয়ত জানেনা। আজকের এই আর্টিকেল থেকে আপনারা প্লেজারিজম (Plagiarism) সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন। এই পোস্টে আমরা আলোচনা করবো-

  1. প্লেজারিজম কাকে বলে?
  2. প্লেজারিজমের প্রকারভেদ।
  3. শতভাগ প্লেজারিজম মুক্ত আর্টিকেল লিখা সম্ভব কিনা?
  4. প্লেজারিজম চেক করার উপায়।
  5. প্লেজিয়ারিজম এড়িয়ে চলার উপায়।

 

প্লেজারিজম কাকে বলে? ( What is Plagiarism)

প্লেজারিজম একটি অপরাধ। এটি বেআইনি কাজ। কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠাননের অনুমতি ব্যতীত কোন লেখা অবিকল নকল বা আংশিক পরিবর্তন করে নিজের নামে প্রকাশ করা বা চালিয়ে দেয়াকে প্লেজারিজম বলে। অর্থাৎ অন্যের লেখা চুরি করে নিজের নামে চালিয়ে দেওয়াই প্লেজারিজম। এর ফলে মূল বা আসল লেখক ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

কোন বিষয় নিয়ে কোন আর্টিকেল বা গবেষণা প্রবন্ধ লিখার জন্য লেখককে বিভিন্ন উৎসের উপর নির্ভরশীল হতে হয়। গবেষণাধর্মী কোন আর্টিকেল বা প্রবন্ধ লেখার জন্য বিভিন্ন উৎস হতে অনেক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এর ফলে লিখা আরও তথ্যবহুল ও সমৃদ্ধ হয়। কিন্তু অন্য কোন উৎস থেকে কোন লিখা নিজের লিখার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করলে ওই উৎসের নাম বা লেখকের নাম নিজ লেখার সাথে সংযোজন করতে হয়। যদি কোন ব্যক্তি তা না করে তাহলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। মূলত এ অপরাধকে প্লেজারিজম বলে।

প্লেজারিজমের সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে। দেশের আইনে এ অপরাধের শাস্তির বিধান থাকলেও সঠিক প্রয়োগের অভাবে অপরাধীরা শাস্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি প্লেজারিজমের সমস্যা দেখা যাচ্ছে শিক্ষাক্ষেত্রে। উচ্চ শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো গবেষণা করে নিজেকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করা। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থায় উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। শিক্ষক থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীরা পর্যন্ত এ অপরাধের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে। এক জনের কষ্টে অজির্ত গবেষণা অনুমতি ব্যতিত অন্যজন নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে দেশ, আগামী প্রজন্ম।

২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এক শিক্ষক ও ক্রিমিনোলজি বিভাগের এক শিক্ষক অন্যের প্রকাশিত লেখা ‘চুরি করে’ নিজের নামে প্রকাশ করেন। পরবর্তী সময়ে তারা অপরাধী হিসাবে প্রমাণিত হলে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শাস্তি দেওয়া হয়। এছাড়া, ২০১৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ-প্রযুক্তি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবুল কালাম লুৎফুল কবীরের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ উঠলে তাকেও শাস্তি দেওয়া হয়। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থীর নামে এই অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া, তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও নানারকম প্লেজারিজম দেখা যায়। ইদানিং এ সমস্যা প্রকট হয়ে উঠছে। একজনের আইডিয়া, কথা, প্রোগামিং কোড, গ্রাফিক্স, ডেটা, ছবি, শব্দ, গান প্রভূতি অনুমতি না নিয়ে অন্যজন ব্যবহার করছে। এর ফলে উৎসের মূল মালিক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে সৃজনশীলতা।

 

আরও পড়ুন: ভিডিও কনফারেন্সিং কি? ভিডিও কনফারেন্সিং এর সুবিধা

প্লেজারিজমের প্রকারভেদ (Types of Plagiarism)

প্লেজারিজম কত প্রকার ও কী কী?

প্রযুক্তি উন্নয়নের সাথে সাথে চুরির কলাকৌশলও আধুনিক হচ্ছে। এর ফলে চৌর্যবৃত্তির প্রকারভেদ করা অত্যন্ত জটিল হয়ে দাড়িয়েছে। তবে মোটা দাগে প্রধানত চার ধরনের চৌর্যবৃত্তি পাওয়া যায়। নিম্নে প্রকারভেদগুলো আলোচনা করা হলো-

সরাসরি বা ডিরেক্ট প্লেজারিজম (Direct Plagiarism)

What is Direct Plagiarism?

অন্যের কোন তথ্য বা লিখা অবিকল কপি বা নকল করে নিজের নামে প্রকাশ করা বা চালিয়ে দেওয়াকে সরাসরি বা ডিরেক্ট প্লেজারিজম বলে। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে না জানিয়ে কোন রেফারেন্স ছাড়া কোন তথ্য ব্যবহার করা অনেক বড় অপনাধ হিসাবে গণ্য হয়। দেশের আইনে এই শাস্তির বিধান রয়েছে।

 

প্যারাফ্রেজ প্লেজারিজম (Paraphrase plagiarism)

What is paraphrase plagiarism?

অন্যের কোন তথ্য বা লিখা হুবহু কপি বা নকল না করে সামান্য পরিবর্তন বা এদিক সেদিক করে নিজের বলে দাবি করাকে প্যারাফ্রেজ প্লেজারিজম বলে। এ প্রক্রিয়ায় উৎস থেকে কোন তথ্য সরাসরি কপি করা হয়না। তবে, শব্দ বা বাক্যের গড়মিল করা হয়।

 

মোকাইক প্লেজারিজম (Mosaic Plagiarism)

What is Mosaic Plagiarism?

কোন রেফারেন্স বা উদ্ধৃতি চিহ্ন (Quotation mark) ছাড়া অন্যের লেখার বাক্যাংশ বা কিছু শব্দ বা তথ্য নিজের রিখার মধ্যে ব্যবহার করাই হলো  মোকাইক প্লেজারিজম। Mosaic Plagiarism অনেকটা paraphrase Plagiarism এর মতো।

 

আরও পড়ুন: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি কাকে বলে? তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সুফল ও কুফল  

অ্যাসিডেন্টাল প্লেজারিজম (Accidental Plagiarism)

What is Accidental Plagiarism?

কোন ব্যক্তি তার গবেষণা বা আর্টিকেল লিখার সময় অন্যের লিখার কোন তথ্য ব্যবহার করলে যদি তার উৎস বলা না হয় অথবা উৎস উল্লেখ থাকলেও যদি ভুল উৎস উল্লেখ করা হয় তাহলে দুর্ঘটনামূলক চৌর্যবৃত্তি বা Accidental Plagiarism বলে।

 

জনপ্রিয় প্ল্যাগারিজম চেকার টুল বা ওয়েবসাইট

প্লেজারিজম চেক করার উপায়? (how to check plagiarism)

প্ল্যাগারিজম চেক করার জন্য অনেক টুল বা ওয়েসাইট রয়েছে। তার মধ্যে কিছু পেইড (paid) আর কিছু ফ্রি। আমরা এ পোস্টে কিছু জনপ্রিয় ফ্রি প্ল্যাগারিজম চেকার (PLAGIARISM CHECKER) নিয়ে আলোচনা করব।

Plagiarismdetector

ইন্টারেস্টিং প্ল্যাগারিজম চেকার সাইট গুলোর মধ্যে একটি হলো Plagiarismdetector. এই সাইটের মাধ্যমে আপনি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আপনার আর্টিকেলে Plagiarism আছে কিনা চেক করতে পারবেন। এই ওয়েবসাইটের ফ্রি এবং পেইড দুটি ভার্সন রয়েছে। আপনি যদি ফ্রিতে চেক করেন তাহলে ১ হাজার শব্দ পর্যন্ত একসাথে ফ্রিতে চেক করতে পারবেন। আর যদি paid ভার্সন হয তাহলে ২৫ হাজার শব্দ পর্যন্ত একসাথে চেক করতে পারবেন।

সাইটের লিংক: plagiarismdetector.net

 

Duplicheker

প্ল্যাগারিজম চেকার সাইট গুলোর মধ্যে আরেকটি সাইট হলো Duplicheker. আপনি এর মাধ্যমে আপনার আর্টিকেলে প্ল্যাগারিজম আছে কি না তা কয়েক সেকেন্ড চেক করতে পারবেন। কিন্তু আপনার আর্টিকেল ১ হাজার শব্দের বেশি হলে আপনাকে paid টুল ব্যবহার করতে হবে।

সাইটের লিংক: duplichecker.com

 

Small SEO Tools

Small SEO Tools খুবই জনপ্রিয় একটি Plagiarism Checker Tools বা ওয়েবসাইট। আপনি এই Tools ব্যবহার করে জানতে পারবেন আপনার লিখায় কত শতাংশ Plagiarism রয়েছে। অথবা আপনার লিখা আর্টিকেল অন্য কেউ কপি করেছে কিনা। চাইলে এই টুলটি ব্যাবহার করতে পারবেন।

সাইটের লিংক: smallseotools.com

 

PaperRater

এটি একটি অনলাইন ভিত্তিক Plagiarism Checker Tools. আপনি এর মাধ্যমে Plagiarism Check করতে পারেন।  বর্তমানে ১৪০ দেশ PaperRater ব্যবহার করছে।  তবে, এটির মাধ্যমেও আপনি ১ হাজার শব্দ পর্যন্ত ফ্রিতে চেক করতে পারবেন। ১ হাজার শব্দের বেশি হলে আপনাকে অবশ্যই Payment করতে হবে।

সাইটের লিংক: paperrater.com

 

আরোও কিছু টুল রয়েছে যেগুলো দিয়ে আপনি Plagiarism Check করতে পারবেন।  সেগুলো হলো-

 

শতভাগ প্লেজারিজম মুক্ত আর্টিকেল লিখা সম্ভব কিনা? (Is it possible to write articles 100% plagiarism free?)

প্লেজারিজম কথাটা শুনলে মনে হয় এটা একটি নিষিদ্ধ জিনিস। এবং যার কোন স্থান সমাজে নেই। কিন্তু এটি একদিক থেকে ভ্রান্ত ধারণা। কেননা, শতভাগ প্লেজারিজম মুক্ত আর্টিকেল লিখা অসম্ভব। জার্নাল ও বিষয়ভেদে কিছু শতাংশ plagiarism গ্রহণযোগ্য। সেটা হচ্ছে 15-20% as a ballpark। যদি রিভিউ জার্নাল হয় তাহলে যথাযথ উদ্বৃতিপূর্বক কিছুটা বেশি plagiarism গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তবে, তা  নির্ভর করবে প্রকাশিত লিখার উপরে।

 

প্লেজারিজম এড়িয়ে চলার উপায় (How to Avoid Plagiarism)

প্লেজারিজম এড়িয়ে চলার জন্য কতগুলো উপায় অবলম্বন করা যায়। সেজন্য সবসময় নিজের ‍বুদ্ধি খাটিয়ে আর্টিকেল লিখতে হবে। অন্য উৎস থেকে তথ্য নিলে তার উল্লেখ থাকতে হবে। উৎস থেকে তথ্য নেওয়ার সময় যেটুকু তথ্য নেওয়া হয়েছে তা সরাসরি উদ্ধৃতি চিহ্নের (“ ”) মধ্যে রাখতে হবে। আর্টিকেল লিখার সময় এ বিষয়টি অবশ্যই মাথায় রাখা উচিত।

 

প্লেজারিজমের ক্ষতিকর প্রভাব (Harmful effects of plagiarism)

প্লেজারিজমের ফলে একজন ব্যক্তির যেমন ক্ষতি হয় তেমনি দেশ ও সমাজেরও ক্ষতি হয়। এর ফলে মানুষের সৃষ্টিশীলতা ধ্বংস হয়। মানুষ জন্মগত বা প্রকৃতিগত ভাবে বেশ কিছু সৃজনশীল উপাদান নিয়ে বড় হতে থাকে। কিন্তু প্লেজারিজমের চর্চার ফলে মানুষের সৃজনশীল বিকাশ হয় না। এটির মাধ্যমে মানুষ সৃজনশীলতা না শিখে চুরি শিখে। এছাড়া, প্লেজারিজমের ফলে দেশের বড় ক্ষতি হতে পারে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ক্ষেত্রে প্লেজারিজমের আশ্রয় নিলে দেশ ও জাতির জন্য তা হুমকি হয়ে দাড়ায়।

 

শেষ কথা

এই পোসে্‌টর মাধ্যমে আপনারা জানতে পারলেন- প্লেজারিজম কাকে বলে? প্লেজারিজমের প্রকারভেদ বা প্লেজারিজম কত প্রকার ও কী কী? শতভাগ প্লেজারিজম মুক্ত আর্টিকেল লিখা সম্ভব কিনা?, প্লেজারিজম চেক করার উপায়, প্লেজিয়ারিজম এড়িয়ে চলার উপায়।

Plagiarism অবশ্যই একটি অপরাধ যা মানুষের সৃজনশীল ক্ষমতাকে ধ্বংশ করে দেয়। আমরা সবসময় Plagiarism এড়িয়ে চলবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button